Skip to content
from the May 2017 issue

দেলবাহার মাখন জ্বালিয়ে ঘি

দেলবাহার

বাংলাদেশের অন্য অঞ্চলে কী বলে জানি না, খুলনা অঞ্চলে একে দেলবাহার বলে, এই নামেই পরিচিত। দুটো ফারসি শব্দ 'দিল' বা 'দেল' আর 'বাহার' যুক্ত হয়ে তৈরি হয়েছে। বাংলায় অর্থ করলে দাঁড়ায় দিল/ দেলÑ হৃদয়, মন, আত্মা। আর বাহারÑ শোভা, সৌন্দর্য, জৌলুস ও চটক। বাহারের আর একটি অর্থ আছে বসন্ত। দেলবাহার অর্থ : মনের শোভা। অথবা হৃদয়ের সৌন্দর্য। অথবা একটু দূরের অর্থ হৃদবসন্ত/ হৃদ্বসন্ত।

তা, ফারসি শব্দের বাংলা অর্থ, শুনতে তা কেতায় যত মনোহারী হোক, জিনিসটি কিন্তু অত জটিল কিছু নয়। সেদিক থেকে বলতে গেলে শুধু নামেই দেলবাহার। একখানি বাঁশ, বেশ মোটা, যাকে বলে তল্লাবাঁশ। ঘরের খুঁটি হয়, এমন একটি পাঁচ-ছয়ফুট বাঁশের আগায় লালচে রঙের গামছা পেঁচানো। গামছাটা কিছুক্ষণ পরপর ভেজাতে হয় গরমকালে। ওই গামছার নীচে ময়দা আর গুড় মিশিয়ে বানানো একটু শক্ত মণ্ড। কিছুক্ষণ বাদে না ভেজালে ও মিষ্টি মণ্ড গলে যাবে। বাঁশটার মাথার দিকটি তাই মোটা হয়ে আছে। কোনও ধরনের কষ্ট কল্পনা ছাড়াই ভেবে নেয়া যায়, আগায় গামছা পেঁচানো একটি খুব বড়ো দেশলাইয়ের কাঠি। একমাত্র আলাউদ্দিনের আশ্চর্য চেরাগের দৈত্য কিংবা রামায়ণের কুম্ভকর্ণ কিংবা মহাভারতের ঘটোৎকচই তা অনায়াসে ম্যাচ বাক্সর গায়ে ঘষা দিয়ে জ্বালাতে পারবে।

ওইটি ঘাড়ে করে নিয়ে হাঁটছেন একজন মানুষ। ডান কি বাম ঘাড়ে। পিছনের দিকে একটু হেলানো ওই বংশদণ্ড। একটু পরপর হাঁক দিচ্ছেন, এই দেলবাহার! যে সময়ের কথা, তখন প্যান্ট পরা রিকশাঅলা দেখা যেত না, ফেরিঅলাও নয়। তাই ওই বংশদণ্ড বহনকারী মানষটি লুঙ্গি পরা; নিক্সন-মার্কেট থেকে কেনা কোনও ন্যাতানো জামা গায়ে, তার ওই হাঁকে পাশে কেউ দাঁড়ালে, কি কিনতে চাইলে বাঁশটা নিজের শরীর সমান্তরালে লম্বালম্বি দাঁড় করাতেন।

লোকটির কোমরের কাছে ঝোলানো একটি চটের থলি। অথবা বাঁশটির মাঝখানে বাঁধা সে থলিটি। ক্রেতার দিকে উৎসুক চোখে তাকালেন, অর্থাৎ কী চাই? কোনটি চাই?

এখন যতটুকু কালি আর কাগজ খরচ করে বোঝানো লাগছে জিনিসটি কী, কেমন, সেদিনের প্রায় শিশু কি বালক ক্রেতাকে তা জানানোর প্রয়োজন পড়ত না। ওই চাহনিতেই অথবা তার থেমে দাঁড়ানোতেই ক্রেতা বলতে পারত কী চাই তার। কিন্তু বিক্রেতাও তো সদা প্রস্তুত জানাতে। মোটরসাইকেল ১ টাকা; ঘণ্টা, বানর, হাতঘড়ি এগুলো ৫০ পয়সা, আর শুধু কাঠিতে পেঁচানো একটুখানি দেলবাহার ২৫ পয়সা। এমনই হিসেব।

ওই মোটা বংশদণ্ডের মাঝখানে বাঁধা থলিটিতে আছে ছোটো ছোটো বাঁশের কাঠি। বিভিন্ন আকৃতির। ক্রেতা তার প্রত্যাশামাফিক জিনিসটি চাইলেই তিনি বানাতে শুরু করবেন। সেই দৃশ্যটি প্রতিবারই চেয়ে চেয়ে দেখার। ওই থলি থেকে বেরুল ছোটো ছোটো বাঁশের কাঠি। তাতেই মুহূর্তে তৈরি হয়ে গেল চাকা, সে চাকায় টেনে টেনে সরু করা ওই ময়দা ও চিনির মণ্ড পেঁচালেন। তারপর দুটো চাকা আর একটি বাঁশের কাঠি দিয়ে জুড়ে দেয়া হল। সেখানেও পেঁচানো হল দেলবাহার। তৈরি হল বাঁশের হ্যান্ডেল, সেখানেও দেলবাহারের প্যাঁচ। এভাবে প্রায় চোখের নিমিষে একটি প্রকৃত মোটরসাইকেল দেলবাহার প্রস্তুত। তুলে দিলেন ক্রেতার হাতে। ক্রেতা, সেই শিশুটি কিংবা বালক বা বালিকাটি এখন ওই মোটরসাইকেলের যে জায়গাটি থেকে মন চায় খেতে শুরু করবে।

একইভাবে তৈরি হবে মোটরসাইকেলের জায়গায় বাইসাইকেল। পেটের দিকটায় সরু। দেলবাহারের ওই ময়দা ও চিনির মিশ্রণের ঢেলা কম। একটা ঘণ্টাও তৈরি হতে পারে তার হাতে, খুব দ্রুত। বানরও, তার সরু লেজটিও বেঁকে থাকবে একদিকে। আর এর যদি কিছুই না-চাই, যাতে দেলবাহারের পরিমাণ খুবই কম প্রয়োজন হবে, সে ক্ষেত্রে তৈরি হবে হাতঘড়ি, হ্যাঁ, হাতে নিলে একেবারে দেখতে হাতঘড়িই। চাইলে বাম হাতে পেঁচিয়ে একটু একটু ডান হাতে ভেঙে বা ছিঁড়ে নিয়ে মুখে তোলা যাবে। ক্রিকেট ব্যাট লোকটি বানাতে পারেন অবলীলায়। ব্যাডমিন্টন কী টেনিস খেলার ছোট্ট একখানি র‌্যাকেটও। আর এসবের বাইরে তো থাকছে অল্প একটু দেলবাহার পেঁচানো একখানি কাঠি। যতদূর মনে পড়ে, দামের দিক দিয়ে সেইটিই সবচেয়ে কম, ২৫ পয়সা, এখনও যাকে সাধারণ্যে বলা হয় চার আনা।

আশির দশকের শুরুতে ইস্কুলের সামনে প্রতিদিনই দেলবাহারঅলাকে দেখা যেত। সেই সকাল সাড়ে ৯টা-১০টার দিকেই তার মূলত আনাগোনা। ইস্কুলের পর্ব শেষ হলে শহরের দিকে, বাজারের ভিড়ভাট্টায়। কিন্তু সেখানে তো আর প্রকৃত ক্রেতা প্রায় জুটতই না। জোটার কথাও না। খেলার সময় স্টেডিয়াম কিংবা ইস্কুলের মাঠগুলোর সামনে আর ছুটির দিনগুলোতে পাড়ার রাস্তা দিয়ে। ওই বাঁশটি ঘাড়ে নিয়ে হাঁক দিতে দিতে এগিয়ে চলেছেন। কিন্তু সন্ধ্যার পরে অথবা একেবারে বিকালের মুখে কখনও দেলবাহারঅলাকে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। তাহলে, সন্ধ্যায় কেউ দেলবাহার খেত না।

কখনও তো দেলবাহার নিয়ে সেই কৌতূহল তৈরি হয়নি যে, গিয়ে দেখি কোথায় তৈরি হয় এই বস্তু। যে বয়সে প্রথম তার কাছ থেকে কিনেছি তখন তা মনে হওয়ারও কারণ নেই। আর প্রায় এক দশকের ভিতরে। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে আমাদের বয়েসিরা যেমন শহর ছেড়ে আসতে লাগল, দিনে দিনে দেলবাহারঅলাকেও তেমন দেখা যেত না। কিন্তু ওই সময়ে একদিন একজনকে তার কাছ থেকে দেলবাহার না কিনলেও তার বিশ্রামের সময়টুকুতে, অথবা আমাদের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে বিড়ি-সিগারেট টানছেন, তখন জানতে চাইলে জানিয়েছিলেন, এর জন্যে আলাদা কারখানা আছে শহরের নাগেরবাজার এলাকায়, সেখান থেকেই তাঁরা প্রত্যেকে পরিমাণ মতো দেলবাহার কিনে এই বাঁশের আগায় পেঁচিয়ে নেন। সেখানেই তৈরি হয় আরও দুই পদের ফেরিঅলার মুখরোচক খাবার আটাকদমা ও তিলেখাজা অর্থাৎ তিলের খাজা। এগুলোর প্রত্যেকটির তৈরি-প্রক্রিয়া প্রায় একই। প্রত্যেকটিতে দরকার হয় পরিমাণমতো ময়দা, চিনি, একটু নাকি দুধও দেয়া হয় সেখানে। তবে লোকটি জানিয়েছিলেন, আগে যেখানে গরুর দুধ দেয়া হত, এখন পাউডার দুধ। কেউ একজন পাশ থেকে বলল, টিনের? বলে শেষও করতে পারেনি, অন্যজন যোগ করে, তা’লি আর এই দামে দেলবাহার বেচা লাগদ না। বস্তায় যে গুঁড়া দুধ পাওয়া যায়, তাই দে।

সেই দেলবাহারঅলা শুনে হেসেছিলেন। তবে যাই দিক, তাকে কোনওক্রমে ভেজাল বলা যাবে না। শহরের এতগুলো শিশু ও বালক-বালিকা প্রতিদিন এই জিনিস চাটে, চেটে চাখে, তাদের কোনও পেটের অসুখ তো হয় না।

তখনও পর্যন্ত, যেখানে এখন প্রায় প্রতিটি বহুজাতিক ও দেশীয় কোম্পানির ভোক্তাসামগ্রীর ভালোমন্দ ভেজাল নিয়ে সর্বত্রই এত তৎপরতা, তা ছিল না; কিন্তু বাজারের হকার ফেরিঅলা যে মানের জিনিসই বিক্রি করুক, সেখানে ভেজাল দিত না। তাদের কারখানা বা যেখান থেকে প্রতিটি মাল কিনতেন তাদের সেখানেও সেই সচেতনতা ছিল।

সেদিন, আমাদের কাছ থেকে ওই দেলবাহারঅলা তাঁর বিশ্রামটুকু নেয়া হয়ে গেলে সরে যেতে যেতে বললেন, খাবেন নাকি একটু দেলবাহার বলে বাঁশের আগায় গামছাখানা সরিয়েছেন। দেখি, সেই শৈশব বা বাল্যের রঙ। সাদার সঙ্গে ঈষৎ লালচে মণ্ড বাঁশের আগায় এক তাল মিষ্টি ময়দার স্তূপ। আমাদের কেউ হয়তো ভেবেছিল বেচতে চাইছেন লোকটি। একজন বলে, 'এখন আমাগো এইয়ে খাওয়ার বয়েস আছে নিকি?' অন্যজন হাতের সিগারেট তুলে দেখায়, 'এহোন খাই এই সাদা চকলেট' বলেই একটা টান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে চরম রসিকজন হয়ে বলল, 'এয়েই আমাগো দেলবাহার।'

লোকটি জানালেন, 'এমনি এট্টু খাইয়ে দেখতেন সেই ইস্কুলে পড়ার দিনের মতন এই দেলবাহার আছে কি না? এমনি এমনিÑ' লোকটির সংকোচ হচ্ছিল মাগনা কথাটা বলতে।

একজন বলল, 'দেন এক কাঠিতে। সবাই সেইহেনদে এট্টু এট্টু ছিঁড়ে নেবানে। বোঝলেন না, বাঙালি মাগনা পা'লি আলকাতরাও খায়।'

লোকটি হেসেছিলেন। আমাদের তরুণমুখে দেলবাহার খাওয়া দেখছেন, 'আছে সেইরম?'

'আছে।' একজন একথা জানালেও, সঙ্গে বলে, 'আর দিয়েন না।'

লোকটি একটু হাসতে হাসতে 'এই দেলবাহার' হাঁক ছেড়ে চলে গেলেন। আমাদের এই মুহূর্তের বাল্য ফিরিয়ে আনতে পেরে যারপরনাই খুশি তিনি।

কিন্তু, এখন তো চাইলেই আর তাকে পাওয়া যাবে না। চারদিকে প্রতিটি দোকানে কত পদের বাহারি মুখরোচক খাবার। এর ভিতরে দেলবাহারঅলা আর কীভাবে হাঁক দেয়।

সেই ঘটনারও এই প্রায় বছর কুড়ি বাদে এখন খুঁজলেও কোথাও একজন দেলবাহারঅলাকে পাওয়া যাবে না। যেন, সেই সঙ্গে মনের সেই শোভা কি হৃদয়ের সৌন্দর্য অথবা হৃদবসন্তটুকু তিনি নিয়ে চলে গেছেন এখনকার শৈশব আর বাল্য থেকে!

 

মাখন জ্বালিয়ে ঘি

লোকটির এক হাতে মাঝারি আকৃতির একটি ছোটো মটকা বা মাইট্। সেইদিকে একটু কাত হয়ে হাঁটছেন। তাই স্বাভাবিক এজন্যে যে, ওই ছোটো মাইট্টা প্রায় পুরোটাই ভর্তি। অর্ধেক ভরতি জলে বা তারও কম জলপূর্ণ সেই মাইটের জলে ভাসছে মাখন। ওপরে কলাইয়ের কানা উঁচু একটি ছোটো থালা, তার ওপর দাঁড়িপাল্লা বাটখারা।

হাঁটতে হাঁটতে লোকটি হাত বদল করেন। এ কাজটি অতি প্রয়োজনীয়। অতীব জরুরি এজন্যে যে, একহাতে কতক্ষণ আর ভার টানা যায়? ভারি এ জলপূর্ণ পাত্র। লোকটি এসেছেন উত্তর থেকে। উত্তর বলতে তখন বাগেরহাট ও খুলনা অঞ্চলের মানুষজন বৃহত্তম ফরিদপুরকেই বোঝে। কিন্তু ফরিদপুর কতদূরে সে ধারণা নেই। কিন্তু লোকটি হয়তো সেদিক থেকে এসেছেন, কিন্তু তা কোনওভাবেই ফরিদপুর নয়। হতে পারে মাদারিপুর কিংবা গোপালগঞ্জ। তাও যদি না হয়, বাগেরহাটেরই থানা মোল্লারহাটও তো উত্তর। লোকটি হয়তো সেদিক থেকেই এসেছে। কিন্তু সবই তো উত্তর। তাই উত্তরের মানুষ। উত্তরের এ মানুষ এসেছেন দক্ষিণের খেপে, রুটিরুজির ধান্দায়। হাতে তার সম্বল এ পাত্রখানি।

এখন ভূগোলের হিসেব মিলিয়ে বুঝতে পারি, ওই দূরত্ব তিনি নৌপথে পাড়ি দিয়ে এসেছেন ফকিরহাটে, বাগেরহাটেরই থানা : তারপর রেলগাড়িতে চেপে এসেছেন বাগেরহাট শহর। হয়তো তাঁর কোনও সহযাত্রী চলে গেছেন খুলনাতে, হয়তো তাঁরা একাধিক। ছোটো এ শহরে তাঁর একা আসাই সই অথবা দুজন। খুলনা তুলনায় অনেক বড়ো শহর, সেখানে গেছেন অন্য কয়েকজন। এ কাজ তাঁরা সপ্তাহে সপ্তাহে করে থাকেন। আর সেই সময়ে করেন, যখন তাঁদের এলাকায় গরুতে প্রচুর দুধ হয়, সেই দুধ থেকে মাখন তুলে তারপর বের হন।

খুব সকাল তখনও, শহরের রাস্তায় ঘোষ মশাই বা ঘোলঅলা বের হন, তিনিও মাখন রাখেন সেই মাখনের ওপর থাকে কলাপাতা। যার যে পরিমাণে চাই, ঘোলের ওপর ভাসমান মাখন থেকে চামচে কেটে কেটে দেন। কিন্তু এ লোকটি তাঁর মতো ঘোল বা মাখন বিক্রেতা নন। আর সে কাজটি করতে হলে এ বেলা উতরে যাওয়ার সময়ে তার আগমন হত না, তিনি আসতেন ভোরে বা সকালে। এখন তাঁর আসার কারণ একেবারেই অন্য। তিনি তাঁর ছোটো মাইটভর্তিমাখন থেকে পাল্লায় মেপে পরিমাণমতো মাখন জ্বালিয়ে ঘি বানিয়ে দেবেন। একেবারে সামনে বানানো ঘি। গৃহস্থের এ নিয়ে কোনও প্রকার আপত্তি থাকবে না। ঘি প্রকৃত অর্থেই একেবারে খাঁটি।

কিন্তু তাও কি চাইলে এ লোক গৃহস্থের সঙ্গে পারেন? হাঁক দিতে দিতে কোনও একটি বাড়ির সামনে এলে, সে বাড়িতে দুপুরবেলা পাতে খাওয়ার ঘি ফুরিয়েছে, সেখান থেকে তাঁর ডাক পড়তে পারে। গৃহস্থের বাড়ির সামনে দাঁড়াতেই তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হল, এ মাখন কোথাকার? লোকটি তাঁর সাকিন বাতলালেন। এরপরের প্রশ্নটিই আসল, এটিই যে তার কাছে জানতে চাওয়া হবে, সেটি যেন তার জানাই ছিল। সেটি হল, এ মাখন গরুর দুধের, না মহিষের দুধের। গরুর হলে হবে গাওয়া ঘি, মোষের হলে মইষাল। এ প্রশ্নটি যে তাঁকে করা হবে, তা তাঁর জানা ছিল। তখনও অবিশ্বাস ছিল, আজও তা আছে, বেড়েছেও মাত্রায়। কিন্তু লোকটি শোনামাত্র তার জিভে কামড় দিলেন। অর্থাৎ, এ প্রশ্ন তাঁকে করা সত্যি বিব্রত করা। এতখানি পথ পাড়ি দিয়ে, এত কষ্ট করে, জেলা ও মহকুমার আল্ ডিঙিয়ে এই যে এসেছেন তিনি, তা কি তাঁদের গুরুর দুধের বদলে মোষের দুধের মাখনের ঘি বানিয়ে খাওয়ানোর জন্যে?

একটা জিনিস তখন ছিল, এখন পণ্যের ক্ষেত্রে সে কাজটি টেলিভিশনই সেরে দেয়। যে কোনও পণ্য নিয়েই প্রচুর মন ভোলানো কথা বলতে তাঁরা কোনওভাবেই পিছপা হন না। বিক্রেতার ধর্মই তাই। এ লোকেরা তাদের মাখনের গুণকীর্তন করতেন প্রায় এক নিমিষে। সোজা কথায়, বেশ কথা জানতেন তাঁরা। বাড়ির সাহেব কি বাবুদের প্রতিটি কথায় মন ভুলিয়ে দিতে পারতেন। সে কথায় খানিক আঞ্চলিকতার টান থাকলেও, শ্রোতার জন্যে পরিবেশনের কায়দাটি একেবারে ফেলে দেয়ার মতো ছিল না।

ওদিকে ক্রেতাও সহজে ছেড়ে দেবেন কেন? এর আগে কবে উত্তর থেকে এমন আসা এক আগন্তুকের জ্বালানো ঘি খাঁটি ছিল না। এর চেয়ে দাম একটু বেশি নিলেও শহরের অমুক মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঘি একেবারে ফেলে দেয়ার নয়। সেখানে এ লোকের মতো সামনে জ্বালিয়ে ঘি বিক্রি করে না ঠিকই, কিন্তু সে দোকানের সুনাম আছে। তাদের জিনিস তো খারাপ নয়। এবার লোকটি হয়তো নিজের পণ্য নিয়ে কিছু কথার র্ছরা ছোটাবেন। এমনকি এ মাখন কেমন খাঁটি তা বোঝানোর জন্যে বলবেন তুলোর আগায় একটুখানি মাখন মেখে তারপর জ্বালিয়ে পরীক্ষা করে নিতে। এতে যদি দুধ ছাড়া অন্য কিছু থাকে তাহলে ওই সলতে কীভাবে জ্বলবে। আর খাঁটি দুধ হলে কীভাবে জ্বলবে, তাও জানান দিয়ে দেন এক ফাঁকে। আর গাওয়া ঘিয়ের গন্ধ তো জ্বাল দিলেই টের পাওয়া যাবে। তাঁদের গ্রামেই কারও মোষ নেই। গরুর ছাড়া অন্য কোনও প্রাণী চরে না তাঁদের মাঠে, ফলে তাঁকে মোষের ঘিয়ের কথা বলে কোনও লাভ নেই।

এবার তাহলে নিজেকে এক প্রকার বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে পেরেছেন তিনি। তাহলে এখন উভয়পক্ষই প্রস্তুত। এবার আসল বিষয়। লোকটি জানতে চাইলেন, কতটুকু ঘি তিনি তাঁদের দেবেন। তখন এ পরিমাপের হিসেব সেরে লোকটি তার পালায় বাটখারা তুললেন, গৃহস্থকে বললেন, যে পাত্রে ঘি জ্বাল দেবেন তেমন একটি পাত্র দিতে। সে-পাত্র এল। পাত্রের সমপরিমাণে বাটখারা দিয়ে পাল্লা দুদিকে সমান করার পরে। এবার লোকটি ওই পাত্রে তুললেন মাখনের এক চাঙড়।

এসব মানুষের সবচেয়ে অবাক করা বিষয় ছিল, তাঁদের হাতের আন্দাজ। দারুণ সেই গুণ। একটা বড়ো আর সমতল হাতায় প্রথমবার অথবা কয়েকবারে যে পরিমাণে মাখন আন্দাজে কেটে তুলে মাপ দিলেন, দেখা গেল তাতেই চাহিদামতো ওজন হয়েছে।

সেখানে, ওই ওজন মাপামাপিতে তাঁর হাত কোনও খেল্ দেখিয়েছে কি না, গৃহস্থের চোখ সেখানে সদাসতর্ক। কিন্তু হয়তো বাটখারা অথবা হাতে কোথাও কোনও কারসাজি থাকলেও থাকতে পারত, হয়তো থাকতও অথবা থাকত না, কিন্তু ওই আন্দাজটা যে ছিল বিস্ময়কর সেটি মানতেই হবে। একেবারে প্রয়োজনীয় পরিমাণমতো মাখন তিনি তুলেছেন। এবার জ্বাল দেয়ার পালা।

এ মাখন জ্বাল দিয়ে ঘি বানানো মানুষের যদি সংখ্যা দুজন থাকেন, তাহলে তাদের সঙ্গে একটি কেরোসিনের কুকার অথবা স্টোভ থাকত। একটু আবডাল মতো জায়গায় অথবা কোনও বাড়ির রান্নাঘরের কোলে অথবা কোনও গাছতলায় তাঁরা অ্যালুমিনিয়াম অথবা লোহার পাত্রে মাখন জ্বাল দিতে শুরু করতেন। আর যদি একজন মানুষ মাখন নিয়ে আসেন, তাহলে তো তাঁর হাতে একটি স্টোভ বা কুকার ঝুলিয়ে রাখার সুযোগ কোথায়? সেক্ষেত্রে তিনি চুলো বা কুকার চাইতেন। যদি কোনও বাড়িতে হিটারের ব্যবহার থাকত, বলতেন সেখানে তাঁকে মাখন জ্বাল দেয়ার সুযোগ করে দিতে। তবে এক্ষেত্রে যে প্রকার সুযোগই থাক, তাকে মাখন জ্বাল দিয়ে ঘি তুলে দিয়ে যেতে হবে। এখন সেই কাজটি করবেন তিনি।

বড়ো একখণ্ড মাখন তাঁর পাত্রে একটু আগে তিনি তুলে নিয়েছেন, অথবা দুই খণ্ড অথবা তারও বেশি। এবার এক নির্দিষ্ট পরিমাণ আঁচে তিনি ওই মাখন গলাবেন। গলতে গলতে তা একসময় তরল হবে, ধীরে ধীরে সেই তেলতেলে তরল ঘন হবে। এমনকি একটু দানাদারও। আর গরুর দুধের মাখন হলে, ঘি হতে হতে চারধারে ম্ম্ করা এক গন্ধ বেরোবে। কোনও কোনও গৃহস্থের অভ্যস্ত চোখ আর নাক এ প্রক্রিয়া চলতে চলতে বুঝে যাবে, লোকটি আসলেই খাঁটি গাওয়া ঘি তাদের দিচ্ছে কি না।

যে পাত্রে ঘি জ্বাল দেয়া হবে, একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রার বাইরে গেলে পাত্রটির ভিতরের চারপাশে পুড়ে আসবে। তখন প্রয়োজন হবে আঁচটা একটু কমিয়ে আর শক্ত হাতায় বা চামচে ওই পুড়ে পুড়ে ওঠা পাশটা বারবার কুড়িয়ে দেয়ার বা চেঁচে দেয়ার। লোকটির অভ্যস্ত হাত। তিনি ধীরে ধীরে কাজটি করবেন কখন ঠিকঠাক বুজকুড়ি উঠবে। সেই তাপ কতক্ষণ রাখতে হবে, প্রতিটি ধাপ অতি যতেœ সম্পন্ন করা তার কাজ।

তবে, সেখানেও যে ঠকাঠকি, কিংবা ওই অঞ্চলের ভাষায় গৃহস্থকে বাড়ি দেয়ার বা টাক দেয়ার বিষয় থাকত না, তা নয়। কখনও কখনও সত্যি এমন ঘটত। ঘটত একেবারে শুরু থেকেই। ওই মাখন কোনওক্রমেই গরুর দুধের ছিল না, ছিল মহিষের দুধের। তবে ডালডা বা মাখনেরই মতো দেখতে অন্য কোনও পদার্থ মেশানোর কারসাজি তখনও তারা ঠিকঠাক শিখতে পারেনি, কিন্তু মোষের দুধকে গরুর দুধ বলে চালানোর প্রচলন কখনও কখনও ছিল। আর সবার হাতে ঘি ভালো হত না। অঞ্চলভেদে এমন কথা তো প্রচলিত ছিল বা আছে। আয়ে সুতার ব্যয়ে কামার; কিংবা সব শেখের কাজ তেল বেচা না, কেউ কেউ দাড়িতেও মাখে। এ দাড়িতে মাখা, অর্থাৎ কাজ প্রায় পণ্ড করার মতো ঘিঅলাও ছিলেন কেউ কেউ। যত জ্বালই দিন, তাদের ঘিতে রঙ ঠিক ধরত না, অথবা একটু যেন পুড়ে যেত। অথবা না পুড়লেও ঠিক দানা তাতে উঠত না।

জ্বাল দেয়া শেষ হলে, লোকটি একটি পরিষ্কার পাত্রে সদ্য তোলা ঘি ছেঁকে ঢেলে দিতেন। অথবা পাখার বাতাসে ঠান্ডা করে ছেঁকে ঢালতেন কোনও কাচের বোয়েমে। খুব ভালো হাতের অথবা ভালো হাতের তোলা গাওয়া ঘি সত্যি অসাধারণ রঙ ধরত। স্বচ্ছ কাচের বোয়েমে সেই ঈষৎ রক্তিম ও হলদের মিশেল ঘিয়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে বেশ লাগত। আর বোয়েমের মুখ থেকে তখন আসছে ভুর ভুর করে সদ্য তোলা ঘিয়ের গন্ধ।

এদিকে লোকটির কাজ শেষ। তিনি এখন যাবেন। মাজার গামছা খুলে একবার মুখ মুছে দাঁড়িয়ে আছেন। একবার একবার হয়তো তাকিয়ে দেখছেন, নিজের কীর্তির দিকে। তার সঙ্গে পাওনা-দেনা শেষ হলে এবার রাস্তায় নেমে আবার হাঁক, আছে মাখন, ঘি তোলবেন?

এ হাঁক এখন আর শোনা যায় না। এরপর, এই গত প্রায় দুই দশকে দেশের কত বড়ো বড়ো কোম্পানি একেবারে খাঁটি ঘি বলে টিনজাত বা বোয়েমভরতি কত পদের ঘি বাজারে ছাড়ল, ছড়াল, কিন্তু সেই ঘিয়ের রঙÑ সব অর্থেই এখন হারায়ে খুঁজি।

Read more from the May 2017 issue
Like what you read? Help WWB bring you the best new writing from around the world.