Skip to content
from the November 2017 issue

আততায়ী তুহিন দাস

আমি তোমাকে এই পঙক্তিগুলো দিচ্ছি
কেননা এগুলো তোমারই প্রাপ্য।
বহু বছর পরে জানতে পারবে
একদিন কেউ তোমাকে এই কথাগুলো লিখেছিল।
আমি লিখছি যখন বাংলাদেশের ওপরে
কালো রাত্রি ঘনিয়ে এসেছে,
আমার বন্ধু লেখক ভীত,
তার বিছানার পাশে একটি বিষন্ন ঘড়ি
হঠাৎ বেজে ওঠে,
তার ঘুম ভেঙে যায়,
তার চোখ আতঙ্কে বিস্ফারিত,
তার মুখ থেকে একটি শব্দ বের হয়, ‘আততায়ী’,
অথচ সে একজন কবি বা লেখক
সে হয়তো বলতে পারতো নক্ষত্রদের কথা
যারা আমাদের অন্ধকারেও পথ দেখায়,
বলতে পারতো এক গানময় পাখির কথা
যে বাসা বেঁধেছে তার বাড়িসংলগ্ন গাছে
সে এখন গান গেয়ে তার সঙ্গীকে খুঁজছে,
রাত্রিবেলা যে চাঁদ প্রচুর ঐশ্বর্য নিয়ে আলো ঝরায় তার কথা
অথবা প্রেয়সী যে অপেক্ষা করে আছে দূরে কোথাও তার কথা;
সে এসব কিছু বলেনি,
শুধু বলেছিল, ‘আততায়ী’।
কেননা সে পরিত্যাগ করেছিল আত্মা, ভূত ও দেবদূতদের—
ঈশ্বরকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে সে বলেছিল
সব শূন্যতা দিয়ে মহাকাশ হয় না।
অন্ধ বিশ্বাসের মুখের ওপরে
তার দরজা বন্ধ করে দেবার শব্দ
আমি শুনতে পেয়েছিলাম,
তার লেখায় আহত হয়েছিল ইসলামাবাদ ও ইস্তাম্বুল,
সে তার অসুস্থ মাকে দেখতে যেতে পারেনি
তাকে অনেকদিন একবেলা না খেয়ে থাকতে হয়েছে,
একটি রুটির জন্য তার আকুতি
আমি কল্পনায় দেখেছি;
কেননা রাস্তায় ছদ্মবেশে তার জন্য
অপেক্ষা করছিল মৃত্যু,
গন্ধ শুঁকে শুকে তাকে খুঁজে বের
করার চেষ্টা করছিল ধর্মান্ধ শ্বাপদেরা।

সমুদ্রে বহমান লবণাক্ত জলের মতো
তার রক্ত আজ উত্তেজিত,
আলোর ছায়ার মতো তার ভাবনা
আজ শীতল;
আমিও তা একদিন অনুভব করেছি,
কেননা আমাকেও পালিয়ে থাকতে হয়েছিল
মৌলবাদীদের চাপাতি থেকে দূরে;
আরেকটি গ্রীষ্মের জন্য আমি অপেক্ষা করে ছিলাম,
প্রথমে ভেবেছিলাম পাহাড়ে চলে যাবো,
কিংবা যাবো সমুদ্রকে বিদায় জানাতে,
আমাকে নিশ্চয় তারা পাহাড়ে বা সমুদ্রে খুঁজে বেড়াবে না,
না—আমি চলে গেলাম দীর্ঘ এক শীতঘুমে,
দিনের পর দিন—সাতটি মাস, চারটি শহরে
নিজ দেশে রিফিউজির মতো;
আমার রুমের পাশে এক গায়ক থাকতো
আমি প্রতিদিন ভোরবেলা তার গান শুনতাম
দেয়ালের ওপাশ থেকে—
যেভাবে জেলখানার ছোট্ট জানালায় কোন পাখি
এসে বসে শিস বাজায়
আর মুক্ত দিনের কথা মনে করায়,
গান শুনে মনে হতো
পৃথিবী কী সুন্দর!
তাকে একটা ধন্যবাদ দেয়া দরকার।
এ রকমটা ভাবতাম যদিও
কিন্তু তার সঙ্গে আমি দেখা করিনি,
কারণ যদি তার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে
কেউ আমাকে চিনে ফেলে—এই ভয়ে!
তখন ক্যান্সারে আক্রান্ত মৃত্যুপথযাত্রী
আমার শুভানুধ্যায়ী শয্যাশায়ী,
আমি তাকে দেখতে যেতে পারিনি,
তার কবরের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে
কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকতে পারিনি।

তবু লেখা আমরা থামাতে পারিনি,
আমি বা সেই ভীত লেখক
যার দুঃস্বপ্নে ‘আততায়ী’ এসে
তার ঘরের কড়া নাড়ছে,
আলোর স্পিন্টার আমাদের হৃদয়ে
বোমার আঘাতের মতো গেঁথে গেছে,
আমাদের যদি মাটিতে পুঁতে পাথরও মারা হ
তবু আমরা বিচ্যুত হবো না
আমরা শান্তির শাদা পতাকা উড়িয়ে বেড়াব,
কোন মিথ্যে ঈশ্বরের প্রশস্তিমূলক হরফ লেখা কালো পতাকা নয়;
চিৎকার করে কথা বলব,
গলা কাটা হলে ফিসফিস করে বলব
আমাদের উচ্চারিত শব্দমালা
এক রক্তনদী বেয়ে হলেও পৌঁছে যাবে আগামী প্রজন্মে;
একটি মাছরাঙা পাখি এসে বসে থাকবে
আমাদের স্বপ্নের পাশে!

Read more from the November 2017 issue
Like what you read? Help WWB bring you the best new writing from around the world.